আখেরি চাহার শোম্বা
➤ অধ্যাপক হাসান আবদুল কাইয়ূম
ফারসীতে শেষ বুধবারকে বলা হয় আখেরি চাহার শোম্বা। আরবীতে যেমন দশমকে আশুরা বলা হয়। কিন্তু এই আশুরা বলতে আমরা বুঝি মহরম মাসের দশ তারিখকে। কারণ এই তারিখের সঙ্গে জড়িয়ে আছে কারবালার মর্মান্তিক ঘটনা। তেমনি আখেরি চার্হ্ াশোম্বা অর্থ শেষ বুধবার হলেও এটা বিশেষ মর্যাদা এবং সৌকর্ষ-শোভিত হয়েছে সফর মাসের শেষ বুধবাররূপে। এই সফর মাসের শেষ বুধবার বা আখেরি চাহার শোম্বা প্রিয় নবী হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের পার্থিব জীবনের শেষ সুস্থতার দিন।
প্রিয়নবী হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম ৫৭০ খ্রিস্টাব্দের ১২ রবিউল আউওয়াল সোমবার সুবিহ্ সাদিকের ওয়াক্তে নূরের অবস্থান থেকে মানব অবয়বে পৃথিবীতে আবির্ভূত হন আল্লাহ্ খলিফা বনী আদমকে পূর্ণ মানবতা দান করার জন্য। এখানে উল্লেখ্য যে, হযরত আদম আলায়হিস্ সালামকে সৃষ্টি করার হাজার হাজার বছর পূর্বে আল্লাহ্ জাল্লা শানুহু প্রিয় নবী হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের নূর মুবারক তথা নূরে মুহম্মদী সৃষ্টি করে তার থেকে বিশ্বজগত সৃষ্টির সূচনা করেন। আলমে আরওয়া বা আত্মার জগতে প্রিয় নবী হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামকে নবুওয়ত ও রিসালত দান করেন। মূলত তিনিই প্রথম নবী। কিন্তু আল্লাহ জাল্লা শানুহু পৃথিবীতে নবী আগমনে ধারাবাহিকতায় তাঁকে সবার শেষে প্রেরণ করেন। তিনি সর্বশেষ নবী হিসেবে পৃথিবীতে তশরিফ আনেন। তাঁর মাধ্যমেই ইসলামের পূর্ণতা আসে।
আল্লাহ্ জাল্লা শানুহু নিয়ামত পরিপূর্ণভাবে পৃথিবীর মানুষের জন্য দান করেন। ইসলামকে পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা হিসেবে সানন্দ অনুমোদন দান করেন, ইসলামের বিজয় বারতা ঘোষিত হয়। আল্লাহ্ রবুবিয়ত কায়েম হয়। সেই প্রিয় নবী নূরে মুজাস্সাম তাজেদারে মদিনা সরওয়ারে কায়েনাত রহমাতুল্লিল আলামিন সাইয়েদুল মুরসালিন নুরুন্ আলা নূর হযরত মুহম্মদ মুস্তাফা আহমদ মুজতাবা সাল্লাল্লহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম পৃথিবীতে যে উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য নিয়ে প্রেরিত হয়েছিলেন তা সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করে তাঁর প্রিয় বন্ধু, তাঁর শ্রেষ্ঠ বন্ধুর কাছে যাওয়ার প্রস্তুতি নিলেন।
যেদিনটাতে শেষ বারের মতো তিনি কয়েক দিন রোগভোগের পর বেশ সুস্থ হয়ে উঠলেন সেই দিন মুসলিম মননে এক মহা আনন্দ মেখে স্মরণীয় হয়ে আছে। মুসলিম জাহানে সর্বত্র দিবসটি পালিত হয়। বিশেষ করে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, দূরপ্রাচ্য এবং মধ্যপ্রাচ্যের কোন কোন অঞ্চলে এটি পালিত হয়। আমাদের দেশসহ এই অঞ্চলে এই দিবসটি আখেরি চাহার শোম্বা নামেই পালিত হয়ে আসছে।
প্রিয়নবী হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের বাণী, কর্ম-উপদেশ এবং সাহাবায়ে কেরামের আমলাদি পরবর্তীতে সংরক্ষণের উদ্যোগের ফলে বিশাল বিশাল ছয়খানি বিশুদ্ধ হাদিস সঙ্কলন গ্রন্থ বা সিহাহ্ সিত্তাহ্ সঙ্কলিত হয়। এ ছাড়াও আরও বহু বিশুদ্ধ হাদিসগ্রন্থ সঙ্কলিত হয়েছে। তেমনিভাবে প্রিয় নবী হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের পবিত্র জীবন ইতিহাসের অতি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়গুলোকে ধরে রাখার জন্য তা আনুষ্ঠানিকভাবে পালনেরও উদ্ভব ঘটেছে। যেমন তার পৃথিবীতে আবির্ভাবের দিন উপলক্ষে উদযাপিত হয় ঈদ-ই-মিলাদুন্নবী এবং আনুষ্ঠানিকভাবে দোয়া করার জন্য মিলাদ মাহফিল এবং সেই মাহফিলের শেষ পর্যায়ে সবাই দাঁড়িয়ে নবীর প্রতি সালাম জানানোর এক উত্তম রীতি প্রচলিত হয়েছে। এ ছাড়াও শব-ই-মেরাজ, শব-ই-কদর ইত্যাদি রজনীগুলো পালিত হয় নবী জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ঘটনা উপলক্ষেই।
আখেরি চাহার শোম্বা প্রিয় নবীর শেষ-সুস্থতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। ৬৩২ খ্রিস্টাব্দে মুতাবিক ১১ হিজরীর সফর মাসের শেষ বুধবারের সূর্য ওঠার আগেই মদিনা মনওয়ারা এবং তার আশপাশের বিশাল অঞ্চলজুড়ে থাকা অধিবাসীদের অন্তরে আনন্দের ঢেউ বইয়ে দিয়েছিল। এখানে উল্লেখ্য, এটি প্রায় ১০ বছর আগে ৬২২ খ্রিস্টাব্দের সফর মাসের শেষের দিকে যেদিন প্রিয় নবী হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম মক্কা মুকাররমা থেকে তাঁর নিত্য সহচর হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাদিআল্লাহু তা’আলা আনহুকে সঙ্গে নিয়ে পনেরো দিন পর মদিনা মনওয়ারার তিন মাইল দূরে কুবা পল্লীতে এসে উপস্থিত হয়েছিলেন। সেদিন এই অঞ্চলের সব মানুষের মধ্যে এক অপরূপ আনন্দধারা প্রবাহিত হয়েছিল। শত শত মহিলা ও ছোট ছোট মেয়েরা আনন্দ-উল্লাসে সমবেত কণ্ঠে সুললিত উচ্চারণে গাইল -
তা’লা আল বাদরু আলাইনা
মিন ছানি’য়া তিল–ওয়া’দা
ওজাবাশ শুক’রু আলাইনা
মা দা আ লিল্লাহি দা
পূর্ণিমার চাঁদ আমাদের উপর এসেছে
ওয়া’দা উপত্যকা থেকে
এবং তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা আমাদের অবশ্য কর্তব্য
যতদিন আল্লাহকে ডাকার মত কেউ থাকবে
তেমনি কয়েকদিন পর তাঁকে কুবা থেকে আনন্দ মিছিল সহকারে হাজার হাজার মানুষ ‘মদিনা মনওয়ারায় আনন্দ প্রকাশ করতে করতে নিয়ে এসেছিলেন সেই আনন্দধারা মদিনাবাসীর মধ্যে সমুদ্র তরঙ্গের মতো আনন্দ তরঙ্গ হয়ে উথলে উঠেছিল। কণ্ঠে কণ্ঠে উচ্চারিত হচ্ছিল: কি আনন্দ! কি আনন্দ!! মুহম্মদ (সা.) আমাদের প্রতিবেশী।
দশ বছর পর সেই আনন্দধারা মাত্র একদিনের জন্য দেখা দিলো মদিনাবাসীর মধ্যে ১১ হিজরীর সফর মাসের এই শেষ বুধবারে। প্রিয় নবী হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম তাঁদের ছেড়ে তাঁর রফিকুল আ'লা- শ্রেষ্ঠ বন্ধুর কাছে চলে যাবেন তা কেউ স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি।
১১ হিজরীর ১৮ সফর অভ্যাসমতো রাতের বেলায় হযরত ‘আয়িশার হুজরা শরীফ থেকে পূর্বদিকে প্রায় দেড় শ’ মিটার দূরে অবস্থিত জান্নাতুল বাকীতে গিয়ে কবরসমূহ জিয়ারত শেষে ফিরে আসার সময় তিনি ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েন। দ্রুত পায়ে তিনি হযরত ‘আয়িশার হুজরা শরীফে শয্যাশায়ী হন। মস্তক মুবারকে ভীষণ যন্ত্রণা অনুভব করেন, তাঁর পবিত্র দেহের তাপমাত্রা অসম্ভব বেড়ে যায়। মুবারক উদরে ভীষণ যন্ত্রণা অনুভব করেন।
এই খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। প্রিয় নবী হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু ‘আলায়হি ওয়া সাল্লামের অসুস্থতার খবরে সবখানে বিষাদের ছায়া নেমে আসে। সবাই এসে ভিড় জমায় মসজিদুন নববীতে। সবারই মনে ভয় জাগে, প্রিয় নবী হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু ‘আলায়হি ওয়া সাল্লাম কি আমাদের ছেড়ে চলে যাচ্ছেন! সবার কাজকর্ম বন্ধ হয়ে যায়। অনেকের নাওয়া-খাওয়া পর্যন্ত বন্ধ হয়ে যায়। সবারই মুখে একই প্রশ্ন তিনি এখন কেমন আছেন? অনেকেই ডুকরে ডুকরে কাঁদতে থাকেন। মা ফাতিমা রাদিআল্লাহু তা’আলা আনহা পাগলিনীর মতো হয়ে যান। সে এক মহাবিষাদময় অবস্থার সৃষ্টি হয়।
প্রিয় নবী হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু ‘আলায়হি ওয়া সাল্লাম মক্কী জীবনে কাফির-মুশরিকদের দ্বারা অত্যাচারিত হয়েছেন, তারা তাঁর এবং তাঁর পরিবার-পরিজনদের আত্মীয়স্বজনদের বয়কট করেছে, খাদ্য পানি সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে, তাঁকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করেছে। মদিনায় হিজরত করে আসার পরও ইহুদী, মোনাফিক ও মক্কার কাফিররা মিলে তাঁর বিরুদ্ধ যুদ্ধ ঘোষণা করেছে, ওহুদের যুদ্ধে তাঁর দান্দান মুবারক শহীদ হয়েছে, ৬২৯ খ্রিস্টাব্দে খায়বারে ইহুদীদের সঙ্গে এক যুদ্ধের সময় জয়নব নামের এক ইহুদী স্ত্রীলোক বিষ মিশিয়ে গোস্ত রান্না করে তাঁকে খাইয়ে মেরে ফেলার চেষ্টা করেছে। শত শত মাইল যুদ্ধাভিযানে তিনি গিয়েছেন। দিনকে দিন না খেয়ে থেকেছেন কিন্তু কখনোই তিনি অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী হননি।
সেই প্রিয় নবী হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু ‘আলায়হি ওয়া সাল্লাম দারুণ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন এটা যেন ভাবাই যায় না। মদিনাবাসী ভাবতেই পারছিল না। ১১ হিজরীর সেই শেষ বুধবার শেষ রাতে তাঁর দেহের তাপমাত্রা স্বাভাবিক হয়ে গেল। সারা জিসম মুবারক ঘেমে গেল। শরীরের সব যন্ত্রণা দূর হয়ে গেল। হযরত ‘আয়েশা সিদ্দিকা রাদিআল্লাহু তা’আলা আনহা তাঁর ওড়না দিয়ে তাঁর সমস্ত শরীরের ঘাম মুছে দিলেন। তিনি গোসল করার ইচ্ছা প্রকাশ করলে কয়েক ডোল পানি নিয়ে আসা হলো, তা দিয়ে তিনি গোসল করলেন। প্রায় ১০ দিন পর তৃপ্তি সহকারে খাদ্য গ্রহণ করলেন। এক প্রশান্তির অনুভব সঞ্চারিত হলো। প্রিয় দুই নাতি ইমাম হাসান ও ইমাম হুসাইন নানাজান সুস্থ হয়েছেন শুনে সেই অতি প্রত্যুষেই ছুটে এলেন। তিনি তাঁদের বুকে চেপে ধরে আদর করলেন, সোহাগ করলেন। মসজিদে নববীতে সালাতে ইমামতী করলেন। মসজিদে নববীতে জনতার ঢল নামল।
হযরত আবু বকর রাদিআল্লাহু তা’আলা আনহু, হযরত উমর রাদি আল্লাহু তা’আলা আনহু, হযরত উসমান (রা), হযরত আলী (রা), হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা) প্রমুখ সাহাবায়ে কেরাম প্রচুর পরিমাণে দান-খয়রাত করলেন। অনেকেই দরিদ্রজনকে খাদ্য দান করলেন, শোকরানা নামাজ আদায় করলেন।
প্রিয় নবী হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম মসজিদুন নববীতে উপস্থিত সকলের উদ্দেশ্যে খুতবা দিলেন। সর্বত্র যেন ঈদের আমেজ। সে আনন্দ যেন ঈদের আনন্দকেও ছাড়িয়ে গেছে। কিন্তু তার পরদিন তিনি আবার অসুস্থ হয়ে পড়লেন এবং ১২ রবিউল আউয়াল দুপুর বেলার দিকে তিনি তাঁর রফীকুল আলার কাছে চলে গেলেন। রেখে গেলেন তাঁর অনুপম আদর্শ, রেখে গেলেন আল্লাহর মনোনীত একমাত্র পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা আল কোরআন। রেখে গেলেন তাঁর মহান সুন্নাহ্। তাই আখেরি চাহার শোম্বা বিশ্ব মুসলিম মননে এক মহাপ্রেম আন্দোলিত করার দিন। এদিন নবী প্রেমে আপ্লুত হওয়ার দিন।
লেখক : পীর সাহেব দ্বারিয়াপুর শরীফ, উপদেষ্টা ইনস্টিটিউট অব হযরত মুহম্মদ (সা), সাবেক পরিচালক ইসলামিক ফাউণ্ডেশন বাংলাদেশ
প্রকাশিতঃ জ/ন/ক/ন্ঠ - অক্টোবর ২৫, ২০১৯

কোন মন্তব্য নেই