সন-তারিখ-নববর্ষ-খ্রিস্টাব্দ
⪼ অধ্যাপক হাসান আবদুল কাইয়ূম ⪻
খ্রিস্টাব্দকে অনেকে আবার ‘ঈসায়ী সন বলে অভিহিত করেন। কিন্তু খ্রিস্টাব্দকে ঈসায়ী সন বলা যাবে কিনা এ নিয়েও কথাবার্তা চলেছিল এক কালে, কেননা ক্রাইস্ট যাঁকে বলা হয়, ক্রুসবিদ্ধ যে ক্রাইস্টকে আমরা দেখি তিনি তো কুরআন মজীদের বর্ণনা অনুযায়ী হযরত ঈসা ‘আলায়হিস সালাম নন।
এ প্রসঙ্গে কুরআন মজীদে ইরশাদ হয়েছে: ওয়াবিকুফরিহিম অক্বাওলিহিম্ ‘আলা-মারাইয়ামা বুহ্তানান্ ‘আজীমা-।
ওয়াক্বাওলিহিম্ ইন্না-ক্বাতাল্নাল্ মাসীহা‘ঈসাব্না র্মাইয়ামা রাসূলাল লা-হি অমা-ক্বাতালূহু অমা-ছলাবূহু অলা-কিন্ শুব্বিহা লাহুম্; অইন্নাল্লাযীনাখ্ তালাফূ ফীহি লাফী শাক্কিম্ মিন্হু;মা-লাহুম্ বিহী মিন্ ‘ইল্মিন্ ইল্লাত্তিবা-‘আজ্ জোয়ান্নি অমা-ক্বাতালূহু ইয়াক্বীনা-।
বার রাফা‘আহুল্লা-হু ইলাইহ্; অকা-নাল্লা-হু ‘আযীযান্ হাকীমা-।
এবং তারা (ইয়াহুদীরা) লা’নতগ্রস্ত হয়েছিল তাদের কুফরীর জন্য ও র্ম্ইায়ামের বিরুদ্ধে গুরুতর অপবাদ (বুহতান) রটনা করার জন্য এবং তাদের এই উক্তির জন্য যে তারা বলে: আমরা আল্লাহর রসূল ‘ঈসা মসীহ্ ইব্নে র্মাইয়ামকে হত্যা করেছি, অথচ তারা (ইয়াহুদীরা) তাকে হত্যা করেনি, ক্রুসবিদ্ধও করেনি কিন্তু তাদের এইরূপ বিভ্রম হয়েছিল। যারা তার সম্বন্ধে মতভেদ করেছিল, তারা নিশ্চয়ই এ সম্পর্কে সংশয়যুক্ত ছিল, এ সম্পর্কে অনুমানের অনুসরণ ব্যতীত তাদের কোন জ্ঞানই ছিল না। এটা নিশ্চিত যে তারা তাকে হত্যা করেনি, বরং আল্লাহ্ তাকে তাঁর নিকট তুলে নিয়েছেন এবং আল্লাহ্ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। (সূরা-নিসা : আয়াত ১৫৬-১৫৮)।
নির্ভরযোগ্য তথ্য থেকে জানা যায় যে, হযরত ‘ঈসা ‘আলায়হিস্ সালামকে ইয়াহুদীরা হত্যা করতে বদ্ধপরিকর হয়েছে, এই খবর পেয়ে হযরত ‘ঈসার ভক্তসহচরবৃন্দ একটি নিরাপদ গৃহে সমবেত হলেন, সেখানে তিনিও গেলেন। মানবতার প্রকাশ্য দুশমন শয়তান ঘাতক ইয়াহুদীদের কাছে গিয়ে হযরত ‘ঈসা ইবনে মারইয়াম (আ.)-এর অবস্থানস্থল সম্পর্কে জানাল।
চার সহস্র ইয়াহুদী দুর্বৃত্ত এসে অবস্থানের গৃহ অবরোধ করল। ইতোমধ্যে আল্লাহ্ জাল্লা শানুহুর নির্দেশে হযরত ‘ঈসা ইবনে মারইয়াম (আ.) আসমানে উত্তোলিত হলেন, আর ইয়াহুদীরা হযরত ঈসা (আ.)-এর মতো দেখতে তায়তালানুস নামের এক ব্যক্তিকে ক্রুসবিদ্ধ করে হত্যা করলা। কুরআন মজীদে ওদের বিভ্রমের ও মতভেদের কথাই বলা হয়েছে। কেননা তায়তালানুসের আত্মীয়স্বজনরা তার খোঁজ করেও তাকে পায়নি। তখনই তাদের মাঝে মতভেদ জাগ্রত হয়। মূলত তায়তালানুসকে হত্যা করে ওরা বিভ্রমগ্রস্ত হয়ে পড়ে।
যা হোক, আমাদের দেশে প্রচলিত ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক গন্ধমাখা খ্রিস্টাব্দটি এদেশে আসে ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সপ্তদশ শতাব্দীতে উপমহাদেশে আবির্ভূত হয় বণিক হিসেবে। ক্রমান্বয়ে তারা ছলে বলে কৌশলে এ দেশটাকে দখল করার অভিসন্ধি এঁটে এগোতে থাকে। মসনদলোভী মীরজাফরকে দলে ভিড়িয়ে ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দের ২৩ জুন পলাশী প্রান্তরে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে বিপর্যয়ের মুখে ফেলে দিয়ে তারা বাংলার স্বাধীনতা সূর্য লুট করে নিয়ে এ দেশের মানুষের স্কন্ধে গোলামির জোয়াল স্থাপন করে দেয়। তাদের পোশাক আশাক থেকে শুরু করে গোলামির জিঞ্জির হিসেবে তাদের পঞ্জিকাটিও চাপিয়ে দেয়।
এই ক্যালেন্ডার তারা গ্রহণ করে রোমানদের থেকে আর রোমানরা গ্রীকদের থেকে। এটা ক্রিস্টিয়ান এরা নামে অভিহিত হলেও রোমানরা একে লাতিন ভাষায় বলে 'এ্যানো ডোমিনি' আমাদের প্রভুর বছর। সংক্ষেপে জানা যায় ডাইওয়নিয়াসম এক্সিগুয়াস নামের এক পাদরি জেসাস ক্রাইস্টের ৫৩২ বছর পর এ বর্ষপঞ্জিকার প্রবর্তন করেন। এই পঞ্জিকা বহুদিন জুলিয়ান পঞ্জিকা নামে প্রচলিত ছিল।
এতে বহু যোগ বিয়োগ হতে হতে ১৫৮২তে রোমের পোপ ত্রয়োদশ গ্রেগরি জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের পরামর্শে প্রচলিত জুলিয়ান ক্যালেন্ডার নামে পরিচিত ক্যালেন্ডারটির ব্যাপক পরিমার্জন করে অক্টোবর মাস থেকে দশ দিন ফেলে দিয়ে অর্থাৎ ৫ তারিখকে ১৫ তারিখ ধরে যে ক্যালেন্ডার প্রবর্তন করেন সেটিই গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার যা আমাদের দেশে ইংরেজী ক্যালেন্ডার নামে পরিচিত।
এই ক্যালেন্ডার ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতার উচ্ছিষ্ট হিসেবে রয়ে গেছে আন্তর্জাতিকতার খাতিরে। সে যা হোক, ইসলাম দিনক্ষণ বর্ষ গণণার ওপর অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়।
আল্লাহ জাল্লা শানুহু ইরশাদ করেন, "ওয়া জা'আলনাল্লাইলা ওয়ান্নাহা-রাআ-ইয়াতাইনি ফামা হাওনাআ-য়াতাল্লাইলি ওয়া জা'আলনাআ-য়াতান্নাহা-রি মুবসিরাতাল লিতাবতাগূফাদলাম মির রাব্বিকুম ওয়ালিতা'লামূ'আদাদাছ ছিনীনা ওয়াল হিছা-বা ওয়া কুল্লা শাইয়িন ফাসসালনা-হু তাফসীলা-।"
আমি রাত ও দিনকে করেছি দুটি নিদর্শন, রাতের নিদর্শনকে করেছি আলোকপ্রদ যাতে তোমরা তোমাদের রব্ এর অনুগ্রহ সন্ধান করতে পারো এবং যাতে তোমরা বর্ষ সংখ্যা (সন) ও হিসাব জানতে পারো এবং আমি সবকিছু বিশদভাবে বর্ণনা করেছি। (সূরা বনী ইসরাঈল: আয়াত ১২)
বর্ষ গণনার এই হিসাব চাঁদের গতি প্রকৃতির হিসাবে হয়ে থাকে আবার সূর্যের গতি প্রকৃতির হিসাবেও হয়ে থাকে, আর এর থেকে চান্দ্র সন আর সূর্য সন বা সৌর সনের প্রচলন হয়েছে। পৃথিবীতে বহু সনের উৎপত্তি হয়েছে তার মধ্যে অনেক সনের বিলুুপ্তি ঘটেছে। আন্তর্জাতিক সনের স্থান যেমন ইংরেজী ক্যালেন্ডার করে নিয়েছে, তেমনি আন্তর্জাতিকতার স্থান অধিকার করার ক্ষেত্রে হিজরী সন বা আরবী ক্যালেন্ডারেরও গুরুত্ব অনেক।
ইংরেজী ক্যালেন্ডার সৌর গণনার অন্তর্গত এবং আরবী ক্যালেন্ডার অর্থাৎ হিজরী সন চান্দ্র গণনার অন্তর্গত। কুরআন মজীদে চান্দ্র সন ও সৌর সনের উল্লেখ রয়েছে।
ইরশাদ হয়েছে: "হুয়াল্লাযি জা’আলাশ্শাম্সা দিয়াআও ওয়াল কামারা নূরাও ওয়া কাদ্দারাহু মানাযিলা লিতা‘লামু ‘আদাদাস্ সীনীনা ওয়াল হিসাব, মা খালাকাল্লাহু যালিকা ইল্লা বিল্ হাক্কি ইউফাস্সিলুল আয়াতি লি কাওমী ‘ইয়া লামুন-।"
তিনিই (আল্লাহ) সূর্যকে তেজস্কর ও চন্দ্রকে জ্যোতির্ময় করেছেন এবং ওর মনযিল (তিথি) নির্দিষ্ট করেছেন যাতে তোমরা বর্ষ গণনা করতে পার এবং সময়ের হিসাবে জানতে পারে। আল্লাহ এসব নিরর্থক সৃষ্টি করেননি। জ্ঞানী সমাজের জন্য তিনি এই সমস্ত নিদর্শন বিশদভাবে বিবৃত করেন। (সূরা ইউনুস: আয়াত ৫)।
সূরা আর রহমানে ইরশাদ হয়েছে: "আশ্শামসু ওয়াল কামারা বিহুস্বান- সূর্য ও চন্দ্র আবর্তন করে নির্ধারিত কক্ষপথে। (আয়াত ৫)।
আল্লাহ জাল্লা শানুহুর সৃষ্টির এই যে অপূর্ব বিন্যাস এবং সময়ের, সনের ও তারিখের হিসাব সংরক্ষণের এই যে ব্যবস্থা তা তাঁর কুদরতের নিদর্শন। বারো মাসে বছরেরই এই হিসাব চাঁদ সূর্যের হিসাবের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েছে তাদের কক্ষপথে আবর্তনের সময়ের নিরিখে। যে কারণে লক্ষ্য করা যায় চান্দ্র সন হয় মোটামুটি ৩৫৪ দিনে আর সৌর সন হয় মোটামুটি ৩৬৫ দিনে।
চান্দ্র সনের ঋতুর সঙ্গে সম্পর্ক থাকে না অর্থাৎ এই সনের কোন মাসই একটা নির্দিষ্ট ঋতুতে স্থির থাকে না। প্রায় তিন বছর অন্তর অন্তর চান্দ্র মাস ঋতু পাল্টায় এবং সেই ঋতুতে সেই মাসে ফিরে আসতে প্রায় তেত্রিশ বছর লাগে। অন্যদিকে সৌর মাস ঋতুতে স্থির থাকে। যেমন : শীতের প্রচন্ড কাঁপুনির মধ্যে প্রত্যেক বছর পহেলা জানুয়ারিতে ইংরেজী নববর্ষ আসে রাত বারোটা এক মিনিটে, অন্যদিকে হিজরী নববর্ষ আসে জিলহজ মাসের শেষ সূর্য অস্তের মধ্য দিয়ে পহেলা মুহরমের চাঁদ দেখা গেলে, আর আমাদের বাংলা নববর্ষ আসে কালবৈশাখীর আশঙ্কা নিয়ে পহেলা বৈশাখ সূর্যোদয়কালে।
উল্লেখ্য, সন ও তারিখ শব্দ দুটো আরবী এবং সাল শব্দটি ফারসী। সন ও সাল শব্দের অর্থ বর্ষ আর তারিখ শব্দের অর্থ দিনাঙ্ক, ইতিহাস প্রভৃতি। তবে আমাদের দেশে দিনাঙ্ক বা ডেট (Date) অর্থে তারিখ শব্দটি ব্যবহৃত হয়। তারিখ শব্দটি আমরা যেমন করে বুঝি দিনাঙ্ক শব্দটি তেমন করে আদৌ বুঝি না। তারিখকেই সর্বস্তরের মানুষ আত্মস্ত করেছে এবং করতে থাকবে।
বছর যে বারো মাসে সে সম্পর্কে কুরআন মজীদে ইরশাদ হয়েছে: "নিশ্চয়ই আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টির দিন হতেই আল্লাহর বিধানে আল্লাহ্র কাছে মাসের গণনা হচ্ছে বারোটি।" (সূরা তওবা: আয়াত ৩৬)।
নববর্ষ একটি ইতিহাসের পাতাকে বুকে ধারণ করে নতুন ইতিহাসের সুন্দর পাতার আশা নিয়ে আবির্ভূত হয়। নতুন বছর সুন্দর হোক, মঙ্গলের হোক, কল্যাণের হোক, প্রাচুর্যের হোক, শান্তির হোক, স্বস্তির হোক- এ আশা সব মানুষের, বিশ্ব বিবেকের।
লেখক : পীর সাহেব দ্বারিয়াপুর শরীফ, উপদেষ্টা ইনস্টিটিউট অব হযরত মুহম্মদ (সা.), সাবেক পরিচালক ইসলামিক ফাউণ্ডেশন বাংলাদেশ
প্রকাশিতঃ জ/ন/ক/ণ্ঠ - ৪ জানুয়ারি ২০১৯

কোন মন্তব্য নেই